২০ জনকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার কথা স্বীকার; নূপুর এবং শেফালী২০ জনকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার কথা স্বীকার; নূপুর এবং শেফালী – দৈনিক গণ আওযাজ
শুক্রবার, ২২ জানুয়ারী ২০২১, ১২:৪০ অপরাহ্ন

২০ জনকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার কথা স্বীকার; নূপুর এবং শেফালী

গণ আওয়াজ ডেস্ক/১২৩বার পড়া হয়েছে
আপডেট :বুধবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২০

ছয়টি লিপস্টিক হারানোর ঘটনায় একবার গুলশান থানায় অভিযোগ করেছিলেন এক তরুণী। সেখানে বলা হয়েছিল, লিপস্টিকগুলোর মোট মূল্য ৯০ হাজার টাকা! রাজধানীর নিকেতনে দুই হাজার ২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে বসবাস করেন তিনি। সার্ভিস চার্জসহ ওই ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৮০ হাজার টাকা। এক সন্তানকে পড়াশোনা করান ভালো স্কুলে। ঘরে দামি সব আসবাবপত্র। বনানীর ডিলাক্স হাউসে তিনি জিম করেন মাসে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে। অথচ তার বৈধ কোনো আয়ের উৎস জানা যায়নি।

পারভীন আক্তার নূপুর নামের এই তরুণীর এই লাইফস্টাইল যে কোনো মানুষকে চমকে দেবে। কারণ লাখ লাখ টাকার আয় না থাকলে তো এমন জীবনযাপন করা সম্ভব নয়। এটি ঠিক, নূপুর আয়-ই করেন, তবে তা করেন তার বোন শেফালী বেগমকে নিয়ে ‘প্রেমের ফাঁদ পেতে’। অন্তত ২০ জনকে এভাবে ফাঁদে ফেলার কথা স্বীকার করেছেন তারা। তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি আদায় করা হয়েছে দুই লাখ টাকা থেকে শুরু করে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত।

সম্প্রতি নূপুর ও তার বোন শেফালীসহ এই চক্রের চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ। বেরিয়ে এসেছে এই চক্রের প্রতারণার চমকপ্রদ সব তথ্য।

গত পাঁচ বছর ধরে নূপুর ও তার বোন শেফালী এই প্রতারক চক্র গড়ে তুলে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী, রাজনীতিবিদসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার লোকজনকে টার্গেট করে প্রতারণা করে আসছিলেন। নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন এমন ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নম্বর সংগ্রহ করে ট্রাভেল এজেন্সির শামসুদ্দোহা খান বাবু প্রথমে নূপুরকে কিছু ব্যক্তির মোবাইল নম্বর সরবরাহ করতেন। এসব নম্বরে কল করে নূপুর কখনও সমাজকর্মী, কখনও উন্নয়নকর্মী কিংবা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য তহবিল সংগ্রহকারী, কখনও চাকরি প্রার্থী বা সাংবাদিক ইত্যাদি পরিচয় দিয়ে কথা বলতেন। কখনও কখনও সরাসরি দেখাও করতেন। টার্গেট করা ব্যক্তিদের সঙ্গে টানা কয়েক মাস প্রায়ই ফোন করে নানা অজুহাতে কথাবার্তা বলতেন নূপুর।
এভাবে আলাপচারিতার মধ্যে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তাও বলতেন নূপুর এবং ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করতেন, অন্য পাশের ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলা সম্ভব কিনা। টার্গেট করা ব্যক্তিও তার সঙ্গে একই স্টাইলে কথা বলতে থাকলে তিনি সেসব কথোপকথন রেকর্ড করতেন। এক পর্যায়ে নূপুর তার এই চক্রের আরেক সদস্য মোবাইল ফোন কোম্পানির সার্ভিস সেন্টারে কর্মরত রুবেল মাহমুদ অনিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। টার্গেট করা ব্যক্তির মোবাইল নম্বর দিয়ে তার স্ত্রী, সন্তানসহ অন্য স্বজনদের মোবাইল ফোন নম্বর থাকলে তা সরবরাহ করতে বলতেন।

এরই মধ্যে টার্গেট ব্যক্তিকে স্বামী সাজিয়ে নানারকম ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে নিতেন নূপুর। পরে টার্গেট ব্যক্তিকে হঠাৎ কোনোদিন ফোন করে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করতেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নূপুর বলতেন, টাকা না দিলে তার এতদিনকার প্রেমের আলাপচারিতার কথা স্ত্রী ও সন্তানদের জানিয়ে দেবেন। তাদের কাছে ফোনকলের রেকর্ড পাঠানো হবে।

এমন ভয় দেখানোর পর অনেকেই নূপুরকে থামাতে টাকা দিতেন। কেউ টাকা দিতে না চাইলে পরিকল্পনামাফিক ভিন্ন কৌশল নিতেন তিনি। বড় বোন শেফালীকে দিয়ে ওই ব্যক্তিকে ফোন করাতেন তিনি। শেফালী বলতেন, ‘আপনি আমার বোনের সর্বনাশ করেছেন। আপনি একজন চরিত্রহীন লোক। যেভাবে আমার বোনকে ব্যবহার করেছেন, সে তুলনায় যে টাকা দাবি করা হচ্ছে, তা খুবই সামান্য। টাকা না দিলে আপনার স্বজনকে জানানো হবে। নারী নির্যাতনের মামলা করা হবে।’

এরপর মো. ইসা নামে চক্রের সদস্যের মাধ্যমে আইনজীবী পরিচয়ে ভুয়া মামলার কাগজপত্রের কপি ওই ব্যক্তির মেসেঞ্জার ও মেইলে পাঠানো হতো। নূপুরের পক্ষ থেকে ওই ‘আইনজীবী’ টার্গেট করা ব্যক্তিকে ফোন করে বলতেন, ‘অহেতুক কেন মামলায় জড়াচ্ছেন? দাবি করা টাকা দিয়ে দেন। নইলে মামলায় দীর্ঘদিনের ঝামেলায় পড়তে হবে।’

প্রায় পাঁচ বছর ধরে নূপুর ও তার বোন এভাবে এমন প্রতারণার ফাঁদ পেতে টাকা-পয়সা আদায় করে আসছিলেন। কোনো ব্যক্তি টাকা দিতে রাজি হলে অধিকাংশ সময় নূপুরের হয়ে তা সংগ্রহ করতেন বাবু। প্রতিটি কাজের জন্য বাবুসহ চক্রের অন্য সদস্যদের ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হতো। বাকি টাকা দুই বোন ভাগ করে নিতেন।

পুলিশ জানায়, এই চক্রের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে দুটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় নূপুর ও রুবেল মাহমুদ অনিককে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, ষাটোর্ধ্ব ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ছিল এই চক্রের টার্গেট। এভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে লোকলজ্জার ভয়ে সাত-আটজন আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে চেয়েছিল। এই দুই বোনের গ্রামের বাড়ি সিলেটে। অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ায় তাদের দু’জনের বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল।

তেজগাঁও বিভাগের এডিসি হাফিজ আল ফারুক বলেন, টাকার বিনিময়ে যেভাবে সিম নিবন্ধনে ব্যবহূত কোনো নাগরিকের গোপনীয় তথ্য পাচার হচ্ছে, তা উদ্বেগজনক ঘটনা। এসব ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদের কোনো গাফিলতি থাকলে সেটাও তদন্ত করে দেখা হবে।

ডিজিএ/এমডিজেএম


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর