তিন দশক পর খুজে পেলেন ছেলেকে।লি জিংঝিতিন দশক পর খুজে পেলেন ছেলেকে।লি জিংঝি – দৈনিক গণ আওযাজ
রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০৭:০৫ পূর্বাহ্ন

তিন দশক পর খুজে পেলেন ছেলেকে।লি জিংঝি

গণ আওয়াজ ডেস্ক/৬১বার পড়া হয়েছে
আপডেট :শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০

লি জিংঝি তিন দশকের বেশি সময় ধরে তার ছেলেকে খুঁজে বেরিয়েছেন। তার ছেলে মাও ইনকে ১৯৮৮ সালে অপহরণের পর বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। তিনি আর কোনদিন ছেলের দেখা পাবেন, এমন আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু গত মে মাসে একদিন তিনি একটি ফোন কল পেলেন, যেটির জন্য তিনি ৩২ বছর ধরে অপেক্ষা করেছেন।

প্রতি সপ্তাহান্তে জিংঝি এবং তার স্বামী তাদের শিশুপুত্র মাও ইনক নিয়ে কোন চিড়িয়াখানা বা শহরের কোন একটি পার্কে নিয়ে যেতেন। তারা থাকতেন মধ্যচীনের শাংজি প্রদেশের শিয়ান শহরে। তার স্মৃতিতে এরকম একটি বেড়ানোর স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

“সেসময় তার বয়স ছিল সাড়ে তিন বছর। আমরা ওকে শিয়ান শহরের চিড়িয়াখানায় নিয়ে গিয়েছিলাম। ও মাটিতে একটি কেঁচো দেখতে পেল। ও বেশ কৌতুহলী হয়ে উঠলো। কেঁচোটি দেখিয়ে বললো, মা, দেখ, একটা কেঁচো। আমি যখন ওকে চিড়িয়াখানা থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছি, ও তখন কেঁচোটি হাতে ধরে আমার মুখের কাছে নিয়ে এসেছে।”

মাও ইন ছিল তার একমাত্র সন্তান। চীনের এক সন্তান নীতি তখন পুরোপুরি কার্যকর। কাজেই একের অধিক সন্তান নেয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না। তিনি চেয়েছেন তার ছেলে খুব ভালোভাবে পড়াশোনা করবে এবং সফল হবে। কাজেই তিনি তার ডাক নাম রাখলেন জিয়া জিয়া, যার মানে মহৎ।

ঝিংজি বলেন, “জিয়া জিয়া ছিল খুব শান্ত এবং বাধ্য ছেলে। স্মার্ট। খুব বুঝদার। ও খুব একটা কাঁদতো না। ও ছিল খুবই প্রাণবন্ত এবং আদুরে। ও ছিল এমন এক শিশু যাকে যেই দেখতো সে-ই পছন্দ করতো।”

ঝিংজি এবং তার স্বামী সকালে ছেলেকে একটি কিন্ডারগার্টেনে দিয়ে আসতেন। এরপর দিনের কাজ শেষে আবার সেখান থেকে তুলতেন।

“প্রতিদিন আমার কাজ শেষ হওয়ার পর আমি আমার ছেলের সঙ্গে খেলতাম। আমি খুবই সুখী ছিলাম।

ঝিংজি কাজ করতেন একটি শস্য রফতানিকারক কোম্পানির সঙ্গে। যখন ফসল তোলার সময় হতো, তখন তাকে শহর ছেড়ে গ্রামে গ্রামে যেতে হতো খাদ্যশস্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে দেখা করতে। জিয়া জিয়া তখন বাড়িতে তার বাবার সঙ্গে থাকতো। একদিন এরকম এক সফরে তিনি তার কর্মচারীদের কাছ থেকে একটি খবর পেলেন। তাকে দ্রুত ফিরে আসতে বলা হলো।

“সেসব দিনে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেই ভালো ছিল না”, বলছিলেন ঝিংজি।

“কাজেই আমার কাছে মাত্র ছয় শব্দের একটি টেলিগ্রাম এসেছিল। তাতে লেখা, বাড়িতে জরুরী দরকার, এক্ষুনি ফিরে আসো’। আমি জানতাম না কী ঘটেছে।”

ঝিংজি দ্রুত শিয়ানে ফিরে আসলেন। সেখানে একজন ম্যানেজার তাকে সেই ভয়ংকর খবরটি দিল।

“আমার নেতা আমাকে কেবল একটা কথাই বললেন, ‘তোমার ছেলে নিখোঁজ।”

আমার অন্তর যেন শূন্য হয়ে গেল। আমার মনে হচ্ছিল হয়তো আমার ছেলে কোথাও হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমার একবারও মনে হয়নি, আমার ছেলেকে আর কখনো খুঁজে পাবো না।”

১৯৮৮ সালের অক্টোবর মাসের ঘটনা এটি। জিয়া জিয়ার বয়স তখন মাত্র ২ বছর ৮ মাস।

জিংঝির স্বামী বলছিলেন, তিনি জিয়া জিয়াকে কিন্ডারগার্টেন থেকে তুলে নিয়ে আসেন। পথে তিনি থেমেছিলেন তাদের পারিবারিক মালিকানাধীন একটি ছোট্ট হোটেল থেকে ছেলের জন্য খাবার পানি সংগ্রহের জন্য। মাত্র এক-দুই মিনিটের জন্য হয়তো তিনি ছেলেকে বাইরে রেখে গিয়েছিলেন। যখন ফিরলেন, সেখানে জিয়া জিয়া নেই।

জিংঝি ভেবেছিলেন, ছেলেকে দ্রুত খুঁজে পাওয়া যাবে।

“আমি ভেবেছিলাম আমার ছেলে হয়তো হারিয়ে গেছে। ও হয়তো তার বাড়ির পথ খুঁজে পাচ্ছে না। কোন দয়ালু লোক হয়তো তাকে খুঁজে পাবে এবং আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনবে।”

কিন্তু এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। কেউ তাকে খুঁজে পেল না, তখন জিংঝি বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি বেশ জটিল।

হোটেলটির আশে-পাশের এলাকায় গিয়ে তিনি জনে জনে জিজ্ঞেস করতে থাকলেন, জিয়া জিয়াকে কেউ দেখেছে কীনা। তিনি জিয়া জিয়ার ছবিসহ এক লাখ লিফলেট ছাপালেন। শিয়ানের রেল স্টেশন এবং বাস স্টেশনে গিয়ে তিনি লিফলেট বিলি করলেন। স্থানীয় কাগজে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দিলেন। কিন্তু কোন কাজ হলো না।

 

“আমার মনে যে তখন কী তীব্র কষ্ট.. আমার কান্না পাচ্ছিল, আমার চিৎকার করতে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমার হৃদয়টা ফাঁকা হয়ে গেছে।”

ছেলের কাপড়-চোপড় দেখলে তখন তার কান্না পেত। ছেলের জুতা, খেলনা- এসব দেখে তার কান্না পেত।

চীনে তখন শিশু পাচারের ঘটনা যে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা জানতেন না জিংঝি।

চীনে এক সন্তান নীতি চালু হয় ১৯৭৯ সালে। এর উদ্দেশ্য ছিল চীনের দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা এবং দারিদ্র বিমোচন করা।

শহরে বাস করেন যেসব দম্পতি, তারা কেবল একটি সন্তান নিতে পারবেন। তবে যারা গ্রামাঞ্চলে থাকেন, তাদের প্রথম সন্তান যদি মেয়ে হয়, তাহলে তারা দ্বিতীয় একটি সন্তান নিতে পারবেন।

যেসব দম্পতি আশা করেছিলেন যে তাদের একটি পুত্র সন্তান হবে এবং পরিবারের নাম ধরে রাখবে, বৃদ্ধ বয়সে তাদের যত্ম নেবে, তাদের সামনে পুত্র্র সন্তানের চেষ্টা করার আর কোন উপায় রইলো না। যদি তারা একের অধিক সন্তান নেন, তাদের বিরাট অংকের জরিমানা করা হবে। তাদের দ্বিতীয় সন্তানকে সব ধরণের সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হবে।

মনে করা হয়, সরকারের এই নীতির ফলে শিশু অপহরণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছেলে শিশু। কিন্তু এর কিছুই আসলে জিংঝি জানতেন না।

“কখনো কখনো টেলিভিশনে নিখোঁজ শিশুর সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞপ্তি থাকতো। কিন্তু আমি জানতাম না যে এসব শিশুকে অপহরণ করে বিক্রি করে দেয়া হয়। আমার কেবল ধারণা ছিল, তারা আসলে হারিয়ে গেছে।”

জিয়া জিয়া হারিয়ে যাওয়ার পর প্রথমেই তিনি দোষ দিলেন তার স্বামীকে। কিন্তু পরে তিনি উপলব্ধি করলেন, ছেলেকে খুঁজে পেতে হলে তাদের দুজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সময় যত গড়াতে লাগলো, তারা এটি নিয়ে এতটাই ঘোরের মধ্যে চলে গেলেন যে তারা আর কিছু নিয়ে কখনো কথা বলতেন না। চার বছর পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেল।

জিংঝি কিন্তু কখনো তার ছেলেকে খোঁজা বন্ধ করেন নি। প্রতি শুক্রবার বিকেল কাজ শেষ করে তিনি ট্রেনে চেপে চলে যেতেন আশে-পাশের বিভিন্ন প্রদেশে। জিয়া জিয়াকে খুঁজতে। রোববার সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি ফিরতেন যাতে আবার পরদিন কাজে ফিরতে পারেন। যখনই তিনি কোন নতুন তথ্য বা সূত্র পেতেন, তার ছেলে জিয়া জিয়ার মতো দেখতে কোন শিশুকে কেউ দেখেছে, তিনি ছুটে যেতেন তদন্ত করতে।

 



বাংলাদেশ সময়ঃ ০২ঃ২২ পি.এম. / ৮ ই আগস্ট ২০২০



 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর