প্রতিক্রিয়ায় পিটার হান্ডকের স্ফটিক গদ্য এবং চিন্তার স্ববিরোধপ্রতিক্রিয়ায় পিটার হান্ডকের স্ফটিক গদ্য এবং চিন্তার স্ববিরোধ – দৈনিক গণ আওযাজ
সোমবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২১, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

প্রতিক্রিয়ায় পিটার হান্ডকের স্ফটিক গদ্য এবং চিন্তার স্ববিরোধ

প্রতিবেদকের নাম :/১৯৯বার পড়া হয়েছে
আপডেট :রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০

অস্ট্রিয়ায় জন্ম হলেও বার্লিনে স্লোভেনিয়ান অধ্যুষিত পানকৌ এলাকাতে বসবাস কিংবা স্লোভেনিয়ান বংশোদ্ভুত মায়ের প্রভাবেই হয়ত বলকান, সার্বিয়া আর যুগোস্লাভিয়া শৈশব থেকেই পিটার হান্ডকের নিকটতম বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পিটার হান্ডকের বাবা ছিলেন একজন ভেয়ামাখট জার্মান সৈনিক। আইন বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি জার্মান ভাষায় অসাধারণ দক্ষতা আর ক্ষুরধার মেধা নিয়ে বেশ অল্প বয়সেই লেখক সমাজে নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন তিনি। কারিন্থিয়া, গ্রেয, বার্লিন, ফ্রান্স, যালসবুর্গ কিংবা প্যারিসে জীবনের বিভিন্ন সময়ে বসবাস করেছেন বিধায় ঘুরে ফিরে তার রচনার পটভূমি হিসেবে শহরগুলো এসে যায়। সে শহরগুলোকে ঘিরে হান্ডকের ভাষার বর্ণিল প্রজাপতি ওড়ে, ঠিকানা খুঁজে নেয় নিজের মতন।

কোন সন্দেহ নেই পিটার হান্ডকে ভীষণ শক্তিমান একজন কথাশিল্পী। সঙ্গোপনে লুকিয়ে থাকা প্রয়োজনীয় আবার অপ্রয়োজনীয় অনুষঙ্গও তিনি মূর্ত করে তোলেন তার অনন্য শব্দ বৈচিত্রে। বিধিবদ্ধ নিয়মের লেখাপত্রে বিশ্বাস নেই তার। বিশ্বাস নেই পুনরাবৃত্তিময় উপন্যাসে, যেখানে ঘুরে ফিরে জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ঘটনাগুলোকেই প্রবাহিত হতে হয়।

তবে হান্ডকে অন্য এক পুনরাবৃত্তিকে পুঁজি করে রূপান্তরের গল্প বলেছিলেন। তার উপন্যাস রিপিটিশন (Die Wiederholung, 1986) ষাটের দশকের এক তরুণকে আবর্তন করে গড়ে উঠেছে। স্লোভেনীয় রক্তের বীজ বয়ে চলা ফিলিব কোবাল নামের স্বপ্নালু সে তরুণ, মানুষের মুক্তির সন্ধানে মগ্ন থাকে উপন্যাস জুড়ে। অস্ট্রিয়ায় বেড়ে ওঠা কোবালের বড় ভাই গ্রেগর বিশ বছর আগে যুদ্ধের ডামাডোলে হারিয়ে গিয়েছিল। ভাইয়ের ছাত্রাবস্থার কৃষিখাতা এবং দাগকাটা স্লোভেনিয়ান-জার্মান অভিধানকে সম্বল করে কারিন্থিয়ার প্রান্তিক মানুষের  জীবন থেকে কম্যুনিস্ট যুগোস্লাভিয়ায় তথা স্লোভেনীয় রূপকথার দেশে অদ্ভুত এক আত্মপরিচয়ের  মুখোমুখি দাঁড়ায় কোবাল। উদ্দেশ্য ছিল গ্রেগরের খোঁজে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। এর ভেতর লেখক সত্তাও জেগে ওঠে। ভাইয়ের জন্য ন্যায়ের খোঁজ করতে করতে কোবালের নিজের আত্মানুসন্ধান, পরিস্ফুট হতে থাকা পারিপার্শ্বিক পৃথিবী হঠাৎই ভীষণ স্বচ্ছ হয়ে ওঠে পিটার হান্ডকের স্ফটিক গদ্যে।

আবার হান্ডকের বিখ্যাত নাটক উইংস অব ডিজায়ারের (Der Himmel über Berlin,1987) কথাই ধরি। বার্লিনের নদী তীরে দাঁড়িয়ে কিংবা উঁচু দালানের ছাদের কিনারায়, আবার কংক্রিটের দেয়ালে বিভক্ত শহরটায় হেঁটে হেঁটে দামিয়েন ও কাসিয়েন নামের দুজন শান্ত সৌম্য দেবদূত সব দেখে, সব শোনে এমন এক অলীক গল্পে দুঃখবোধ জাগিয়ে তোলেন ভীষণ বাস্তবতায়। দেবদূতেরা মহাকালের সাক্ষি হয়ে স্মৃতিচারণ করে আদিম কোন নদীর, হিমবাহের গলে গলে পড়ার অথবা হলোকাস্টের পাথর সময়ের। আত্মহত্যা করতে উদ্যত যুবকের কাঁধে হাত রাখে, আকস্মিক দুর্ঘটনার শিকার কোন মানুষের জন্য সান্ত্বনার চোখ নিয়ে পাশে দাঁড়ায়। আবার এদেরই কেউ সার্কাসের মেয়েটিকে হৃদয়ও দিয়ে ফেলে এরই ভেতর।     

দেবদূতেরা সফেদ ডানায় ভর করে হলোকাস্টের শিকার হওয়া মানুষটির হৃদয়ের কথা শোনে অগোচরে, পুত্রের দুশ্চিন্তায় মগ্ন পিতা-মাতাও তাদের দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এক সময়, রাস্তার ট্রাম আর পথচারীদের ভীষণ ব্যস্ত ছুটে চলাও দেখতে পায়, আর চোখাচোখিও হয়ে যায় এক তরফা। সব মিলিয়ে উইংস অব ডিজায়ার হচ্ছে এক কল্পনা, নিবিড় ধ্যান আর শোকগাঁথার সমন্বিত নাম যেখানে ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা আধেক। স্পর্শের ক্ষমতা যেখানে নেই, হৃদয় যা বলতে চায় তা অব্যক্ত থেকে যায়, দেখা দিতে চাইলেও দৃষ্টির সীমানায় জায়গা করে নেয়া যায় না। হান্ডকে তার সৃষ্টিকে এমনভাবে বিন্যাস করেন যেন মনে হয় কোন তাড়াহুড়ো নেই কোথাও, আপনাতেই ডানা ঝাপটাবে সময়, ধীরে। ইতিহাসের অনুষঙ্গও আরোপিত তো নয়ই বরং ভারী অনর্গল মনে হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় এটাই যে বার্লিনের আকাশ থেকে নাগরিকদের সুখ-দুঃখের ব্যপারে যত্নবান দেবদূতদের আগমন ঘটে যার গদ্যে সেই একই মানুষ কেমন করে সারায়েভো সেব্রেনিৎসার অগণিত মানুষের মৃত্যুকে অন্যায় হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ থাকলেন? বরং অকপটে বলেছিলেন, সারায়েভোতে গণহত্যার মঞ্চ সাজিয়ে বসনীয়রা অভিনয় করেছে। সেব্রেনিৎসার মুসলিম নিধন নিয়েও উত্থাপন করেছেন সন্দেহ। তার সামনে হত্যাযজ্ঞে নিহতদের ছবি কিংবা সার্ব বর্বরতার দলিল দস্তাবেজ রাখা হলে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ঐ মৃতদেহগুলোকে নিয়ে অশ্লীল বাক্য ছুঁড়তে কুণ্ঠাবোধ করলেন না। সহানুভূতি আর সান্ত্বনায় তারই সৃষ্ট চরিত্রদের মতো নীরবে পাশে থাকার প্রশ্নটিও এতটা অবান্তর হবে কে ভেবেছিল?

দ্য গোলি’স এংযাইটি অ্যাট দ্য পেনাল্টি কিক (Die Angst des Tormanns beim Elfmeter, 1970) নাটকে উদ্দেশ্যহীন অথচ আনমনে উদ্দেশ্য খুঁজে বেড়ানো, বেখেয়াল অথচ বিচক্ষণ জোসেফ ব্লখকে পাঠকের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেন। জোসেফ ব্লখ একটি ফুটবল দলের গোলকিপার। নিজের অমনোযোগ অথবা উদাসীনতায় প্রতিপক্ষের বল তার জালে আটকা পড়ে যায়। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে ব্লখকে দল থেকে বের  করে দেবার পর তার সামনে এসে দাঁড়ালো বিচিত্র অনিশ্চয়তা একইসঙ্গে নিদারুণ এক নির্লিপ্ততাও। কোন  কারণ এবং ব্যাখ্যা ছাড়াই এক সদ্য পরিচিতাকে খুন করে ফেলার পরেও ব্লখের ভেতর কোন অনুশোচনাবোধ কিংবা অনুভূতির নির্লজ্জ অনুপস্থিতিকে পিটার চিত্রায়িত করেছেন তার নিজস্ব জাদুকরী ভাষায়, লেখার কৌশলে। প্রতীকে, ছবিতে, চিহ্নে, ঘরের অগুরুত্ববাহী আসবাবেই হয়ত মানব মনের আরেক অবস্থানকে স্পষ্ট করতে চেয়েছেন ঝাপসা জানালার কাঁচ মুছে দেবার মতন করে। ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা মাথার খুনে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনকে ছোট ছোট বাক্যে অথবা কথোপকথনে। হান্ডকে নিজেকে দাবি করেন কেবল আমোদপ্রিয় একজন মানুষ হিসেবে যার সীমান্তের প্রয়োজন নেই, যিনি রাজনীতি তেমন বোঝেন না- বুঝতে ইচ্ছুকও নন। সে অর্থে তার নিজস্ব কোন স্বদেশের দরকারও নেই। হান্ডকের আরও দাবি- তিনি শুধুমাত্র এক লেখক বিশেষ। যার শেকড় প্রোথিত আছে হোমারে কিংবা সার্ভেন্তেসে। তিনি চান না তাকে কেউ প্রশ্ন করুক। আবার সেই তিনিই আগাগোড়া পক্ষপাতে জড়িয়ে যান, নিরাপরাধের খুন লাগা শাসকের স্তুতিবাক্যে আসর জমিয়ে তোলেন।

হান্ডকের শ্রেষ্ঠত্ব গতানুগতিক নাটক সৃষ্টি না করাতে। তার নাটকের পাণ্ডুলিপিতে সংলাপের বুলি আর কাহিনি থাকতেই হয় এমন না। অনেক সময় আলাদা করে কোন চরিত্রও থাকে না, কেবল কথকে তৈরি করেন ভিন্ন মাত্রার আবেদন। পরিণতির ব্যপারে হান্ডকে কোন সিদ্ধান্তেও আসেন না বরং চরম মুহূর্তে নিয়ে গিয়ে দর্শককে যেন একা মাঠে ছেড়ে দিতে চান। যেমন ছেড়ে দেন কলাকুশলীদের। তারা কোন নির্দেশনার প্রয়োজন ছাড়াও নিজেদের মতন করে মঞ্চ সাজাতে পারেন। এতটা উদার যার সৃজনকর্ম কীভাবে তিনি জাতিসত্তার ভিন্নতা কিংবা স্বার্থের দেখভাল করতে গিয়ে এমন সঙ্কীর্ণ হলেন, হঠকারী রাজনৈতিক হিসেব কষলেন? মানুষের লাশের স্তুপ নিয়ে ঠাট্টায় বিভোর হলেন? সেই অঙ্ক বড্ড জটিল- হিসেব মেলে না।

কবিতাও তো লিখেছেন হান্ডকে। কবিতার শৈশবসংগীতে নালা-ডোবার আর খরস্রোত জলরাশির সমুদ্রে রূপান্তরের শিশুতোষ চাওয়া ছিল তার। পা আড়াআড়ি বসা, চুলের গোছায় ছবির ভেতর মুখ হারিয়ে ফেলা, ইচ্ছেমাফিক গতিবদল কিংবা সূর্যের নিচে স্পর্শীয় জীবন নিয়ে হান্ডকেই তো প্রশ্ন উত্থাপন শেখাতে চান। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। তার কবিতা অনুযায়ী লাখো মানুষের সঙ্গে একজন মানুষকে যেহেতু স্থিতিকাল ভাগ করে নিতে হয় সে কারণে তিনি প্রশ্নে স্বতঃস্ফূর্ত হবেন এমনটাই তো ভাবাই যায়।

অথচ নোবেল পুরস্কার ঘোষণার কয়েকদিন পরই সাংবাদিকদের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে ঘোষণা করলেন- তাদের সঙ্গে তিনি আর একটি কথা বলতেও রাজি নন। সাংবাদিকরা যেন তার ওপর প্রশ্নের পারমানবিক ঝড়েই তুষ্ট বেশি, না তারা তার কাজ নিয়ে কিছু জানে- না তার লেখা পড়েছে কখনো, ধারণা প্রকাশ করলেন হান্ডকে। বলকান যুদ্ধের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন আর প্রতিক্রিয়ায় প্রচণ্ড বিরক্তি প্রকাশ করতে পিছু হটলেন না সুক্ষ্ম মানবিক জীবনবোধের এই মহান লেখক। কী অসামান্য মননে কোথেকে যেন শোক জাগিয়ে তুলতে জানেন যিনি হৃদয়ের খুব গভীর থেকে। লিখছিলেন,

চাকায় চাকায় পুড়তে শুরু করেছে শুকনো পাতারা, আর

শব্দরা অনন্ত মন্থরতায় কুঁকড়ে যাচ্ছে নিজেদের ভেতরে:

“এই তো শোকের প্রান্তরেখা!”

এই প্রান্তরেখা শোকের৷

এখানেই শব্দরা থেমে যায়, শুরু হয় শোক৷

(শব্দের প্রান্তরেখা, দেবব্রত চক্রবর্তী অনূদিত)

চার-চারটি বছর ধরে যখন ক্রমাগত খুন, দণ্ড আর ধর্ষণের ঝাঁঝরা হলো বিজেলিনা কিংবা সার্বিয়ার সীমান্তবর্তী অন্যান্য শহরগুলো; প্রিয়েডর, ভিজেগার্ড, যভরনিক, ভ্লাসেনিৎসা, টুযলা, ফোসা কিংবা জাতিসংঘ ঘোষিত নিরাপদ নগরী সেব্রেনিৎসা যে পূর্ণগ্রহণের অন্ধকারে বিপুল পরিমাণে রক্তপাতে নিস্তব্ধ হল; হান্ডকের হৃদয়ে শোকের শুরু হলো না কেন, সে এক বিস্ময়!

১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হান্ডকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত গ্রন্থ A Journey to the Rivers: Justice for Serbia তে লিখলেন, সার্বিয়া হচ্ছে সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার। মিলোশেভিচের দেহত্যাগের পর তার ঘোষণা ছিল, “আমি সত্য জানি না, তবে আমি দেখি, শুনি, অনুভব করি, স্মরণ করি, যার  কারণে আমি আজ এখানে, যুগোস্লাভিয়ার কাছে, সার্বিয়ার কাছে, স্লোবোদান মিলশেভিচেরও কাছে আমি  আমার নৈকট্য খুঁজে পাই।” মাত্র ৮৩ পাতার ভ্রমণবৃত্তান্ত  A Journey to the Rivers: Justice for Serbia  (Eine winterliche Reise zu den Flüssen Donau, Sava, Morawa und Drina oder Gerechtigkeit für Serbien) প্রকাশিত হবার পরপরই বিতর্ক পিছু ছাড়ছিলই না কারণ সেখানে গণহত্যার দায়ে সার্বিয়ান অভিযুক্তদের পক্ষে সাফাই গাওয়া আছে, আছে প্রলুব্ধ করবার এক ইচ্ছে।

বইটিতে হান্ডকে নির্যাতিত এবং ভুল বোঝাবুঝির শিকার এক জনগোষ্ঠী হিসেবে সার্বদের তুলে ধরেছেন। লিখলেন, তার পুরো শীতার্ত যাত্রায় তিনি সার্বিয়াকে কোনভাবেই দিকভ্রান্ত-পথভ্রষ্ট এক ভূমি হিসেবে দেখতে পেলেন না, বরং এমন একটা বিশাল কক্ষ তার সামনে প্রতিভাত হলো যা ভরতি হয়ে আছে অনাথ এবং পরিত্যক্ত সন্তানে। অথচ সে খবর কে জানে? একজন আগন্তুকই বা কেমন করে অবগত হবে?

হান্ডকে অবশ্য যুগোস্লাভিয়ার নিন্দায় কিছু বলা হয়নি বলে আত্মপক্ষ নেন। তার আপত্তির জায়গাটা শুধুই সার্বদের নিজভূমে অনাহূত হওয়া নিয়ে। ন্যাটো এয়ার স্ট্রাইক এবং পশ্চিমের ভূমিকা নিয়ে কেন কেউ প্রশ্ন করছে না, তার চরম আপত্তিটা সেখানেও।

জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভাষার প্রতি হান্ডকের আজীবনের মনোযোগ ছিল। তবে বিতর্কিত বইটিতে বিষয়বস্তু নির্ধারিত করেছে ভাষার গতিবিধিকে। হান্ডকের বলতে চাওয়া বিষয়টা পশ্চিমা বিশ্ব বলকান যুদ্ধকে কীভাবে চিত্রায়িত করতে চায় সে কেন্দ্রিক। হান্ডকের বলতে চাওয়া বিষয়টা পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষপাতকে ঘিরে, যেখানে সার্বদের সারা বিশ্বের কাছে যতটা বর্বর-নিষ্ঠুর হিসেবে বরাবর তুলে ধরা হয়ে থাকে, প্রকৃতপক্ষে আসল সত্য তেমন না। বরং পশ্চিমা মিডিয়াগুলো সার্বদের প্রতি বসনিয়ান কিংবা ক্রোটদের চক্রান্তকে একরকমের উদযাপন করতেই পছন্দ করে।  

হান্ডকের দানিয়ুব, সাভা, মোরাভা, দ্রিনা নদীর নিঝুম শীতযাত্রার নেপথ্যের কারণ ছিল সম্ভাব্য আড়ালে থেকে যাওয়া ঘটনার সুলুক সন্ধান। সার্ব প্রত্যক্ষদর্শীদের বেদনার জায়গাটা আরও নিবিড়ভাবে অনুভব করা ও পৃথিবীকে জানিয়ে দেয়া। সে লক্ষ্যে সার্বিয়ানদের স্রাপ্সকি ভাষা জানা অনুবাদক সঙ্গে নিয়েই তার জলভ্রমণের শুরু। হান্ডকের মনে হচ্ছিল বসনিয়া থেকে বিতাড়িত সার্বদের নিয়ে গঠিত রিপাবলিকা স্রাপ্সকাই হচ্ছে ২০০০ বছর আগের বিশুদ্ধ ইউরোপের সত্যিকারের প্রতিচ্ছবি। স্লোভেনিয়া, ক্রোশিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া ছুঁয়ে যাওয়া নদী বেয়ে সার্বিয়ার জন্য ন্যায়বিচার খুঁজতে বেরোলেন হান্ডকে। এই খোঁজ করাটা দোষনীয় হবার কথা ছিল না। ন্যাটোর এয়ারক্র্যাফট কমব্যাট মিশনে সার্বিয়া মন্টেনিগ্রোর হাজারো মানুষ আহত-নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছিল। হামলায় মুখ থুবড়ে পড়া সার্বদেরও কিন্তু সেই বলকান দাঙ্গাতেই বেশ ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছিল। পরবর্তীতে ম্যাসাকার শেষে সার্বিয়া অর্থনৈতিক মন্দায় বিপর্যস্ত এক ভূমি হিসেবে আবির্ভুত হল যেখানে উত্তাপের ব্যবস্থা নেই তবু শীত আসে, রাজপথের কিনারে পড়ে থাকে পরিত্যক্ত যানবাহন অথচ পেট্রল নেই, কেউ কেউ তখন অতি কষ্টে যোগাড়যন্ত্র করে ব্ল্যাক মার্কেটে পেট্রল বিক্রি করে বাঁচতে চাইলো। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পেলো ভীষণভাবে। সাধারণ সার্ব জনগণ নিজেদের প্রতারিত ভাবা শুরু করলো। দু’চামচ স্যুপ আর রুটির টুকরোর সংকটেও তাদের দিন গুজরান করতে হচ্ছিল। কারো কারো জীবন চলছিল মাত্র এক দিনারের ওপর নির্ভর করে। ইউরেনিয়ামের প্রভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো রেডিওঅ্যাক্টিভ দূষণের শিকার ছিলো দীর্ঘদিন।

তবে ন্যাটোর হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি বেমালুম মানবতাবিরোধী অবস্থানে চলে গেলেন এবং সার্বিয়ানদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যায় নিরঙ্কুশ সমর্থনও দিয়ে ফেললেন এটা তার অসংখ্য শুভাকাঙ্খীর জন্য তীব্র হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টিতে সার্বদের ভাগ্যটা হলোকাস্টের শিকার ইহুদিদের মতো অথচ গণহত্যায় নিহত মুসলিম মৃতদেহ নিয়ে সেই তিনিই ঘৃণ্য গালি দিতে দুবার ভাবেন না। কসোভো যুদ্ধ চলাকালে সার্বদের সমর্থনে আওয়াজ তোলারও আহ্বান জানিয়ে ফেলেন নির্দ্বিধায়। হান্ডকে নিন্দা জানিয়ে বলেন, সেব্রেনিৎসার অদূরের গ্রাম থেকে যখন অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হলো তখন মুজাহিদীনরা কেন অর্ধশত মানুষ মেরে ফেললো, যাদের এক তৃতীয়াংশই ছিল বেসামরিক? যে কোন নিরাপরাধ প্রাণ জুলুমের শিকার হলে মানবতার দাবি হলো কষ্ট অনুভব করা। সে অর্থে হান্ডকের অভিযোগ-দুঃখবোধ শতভাগ সঠিক। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে তখনই যখন বসনিয়ার কোল ঘেঁষা দ্রিনা নদীর অন্য পাশ থেকে আসা সার্ব মিলিশিয়াদের জ্বালাও পোড়াও, নির্বিচারে খুনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া হয়, আড়াল করা হয়, বৈধতাও দেয়া হয়।

স্বার্থসর্বস্ব রাজনীতির ময়লা চোরাগলিতে পথভ্রষ্টের মতো চক্রাকারেই ঘুরতে থাকলেন এই মেধাবী সাহিত্যিক? আত্মপক্ষ নিয়ে ব্যাখ্যার চেষ্টাটাও মানবতার ইতিহাসের সঙ্গে মানানসই হয়নি কোনবারেই। গণহত্যার নায়কের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন বারবার। বলেছেন নানান অবিবেচনাপ্রসূত কথা। ক্ষোভ, বিতর্ক ও প্রশ্ন বাড়তে থাকলে সেগুলো মুখ ফসকে বের হয়ে গিয়েছে কৈফিয়ত দিতে চেষ্টা করেন। আরও জানিয়ে দেন, অতীতেও তিনি যা কিছু দীর্ঘ সময় ধরে মাথায় গেঁথে রাখতেন ভুলভাবে বলে ফেলতেন। সেই সঙ্গে নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করতে চান শুধুমাত্র একজন লেখক হিসেবে, বিচারক হিসেবে না। আর মিলোশেভিচের ভাগ্যকে বিয়োগান্তক ভাবতেও তিনি রাজি নন, আবার রাজি নন মহানায়ক হিসেবে ভাবতেও। সবসময়ই তিনি সার্ব অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন তবে তিনি এটাও দাবি করেন যে প্রসঙ্গ সার্বিয়া এবং সার্ব হওয়াটা উচিৎ ছিল কিন্তু সবসময় মিলোশেভিচে এসে ঘুরপাক খায়।

হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে বিচার চলাকালীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা মিলোশেভিচের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিতি এবং বিশ হাজার লোকের সামনে স্তুতিবাক্য পাঠ নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হলে উত্তরে হান্ডকে স্পষ্ট করে বলেন, ২০০৬ সালে যে স্থানে ছিলেন সেখানে তার থাকাটাই উচিৎ হয়েছে। মিলোশেভিচ যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনকে সবসময় ঠেকাতে চেয়েছিল। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যুগোস্লাভিয়ারও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া।

মৃত্যুর আগে মিলোশেভিচকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ওঠানো হলে হান্ডকে ট্রাইব্যুনালকে অবৈধ বলে অভিহিত করেন। ঠাট্টা করেন ট্রাইব্যুনালের কোরিয়ান ও জ্যামাইকান বিচারকদের নিয়ে। সেই সঙ্গে মিলোশেভিচের বিচার যাতে সার্বিয়াতে হয় এও দাবি করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মিলোশেভিচের ব্যপারে বিমাতাসুলভ আচরণ করতে পারে বলে অনাস্থা প্রকাশ করেন। এছাড়া ম্লাদিচ ও কারাদজিচের ব্যপারে আদালত আগেভাগেই অপরাধী সাব্যস্ত করে ফেলেছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।

মিলোশেভিচ বিষয়ক যে কোন আলোচনাতেই তিনি যে একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সেটা মনে করিয়ে দিতে পছন্দ করেন হান্ডকে। তার মতে মিলোশেভিচ দশ বছর ধরে সার্ব স্বার্থ রক্ষায় যা করেছেন, অন্য কেউ তার জায়গায় থাকলে একই কাজ করতেন। সেই সঙ্গে বলেন, কোন ব্যক্তি মিলোশেভিচ নামটির আগে বলকানের কসাই, পিশাচ, খুনি এইসব বিশেষণ না বসালেই তাকে মিলোশেভিচপন্থী ধরে নেয় বিশ্ববিবেক। অথচ হান্ডকে তো বলতে চান যে তিনি সার্বপন্থী এবং এই পন্থা নিয়ে তার অহংকারের জায়গাটা অনেক বড়।

সব মিলিয়ে গেলেও উনিশে পিটার হান্ডকের নোবেলপ্রাপ্তি ছাই চাপা আগুনে যেন ঘি ঢেলে দিলো। আলোচনা-সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠল বসনিয়া, ক্রোশিয়া, কসোভো, আলবেনিয়াসহ সারা বিশ্ব। হোক সেটা আলোচনার গোল টেবিল কিংবা চায়ের কাপ, টেলিভিশনের পর্দা কী সোশ্যাল মিডিয়ার আকাশ-নীল দুনিয়া, অথবা হোক সেটা সেব্রেনিৎসার গণকবরের এক পাশে মিলোশেভিচের নির্মম সিদ্ধান্তের জীবন্ত বলিদের কোন ছোট্ট শোকার্ত জমায়েত।

সার্বিয়ার অল্প সংখ্যক জার্মানভাষাভাষী বন্ধুদের ভেতর হান্ডকে অন্যতম। ন্যাটো হামলা শুরু হবার পর পশ্চিমা বিশ্বকে যুদ্ধ দেবতার আরাধনায় মগ্ন কসাই হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন তিনি। সমস্যা সে আখ্যাতে না, বরং সমস্যা তার রাজনৈতিক দর্শনে। ইসলামোফোবে ভোগা, আত্মকেন্দ্রিক কিংবা ইগোইস্টিক জাতীয়তাবাদী মানসিকতার।  হান্ডকের এক সময়ের তারিফকারী সুসান সনট্যাগ পুরোনো অবস্থান থেকে সরে এসে হান্ডকের রাজনৈতিক চিন্তাধারা আর দৃষ্টিভঙ্গিকে জঘন্য ও ভুল বলে মতামত ব্যক্ত করেন। ফরাসি দার্শনিক আলাইন ফিঙ্কেলকুর্টের সুরটাও কাছাকাছি। তার হিসেবে হান্ডকের আদর্শিক রূপান্তরটা দানবীয়। 

অন্যদিকে তৎকালীন ন্যাটো হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন জার্মান নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস। যুদ্ধোত্তর জার্মানির মোরাল কম্পাস হিসেবে খ্যাত এই সাহিত্যব্যক্তিত্বটি পশ্চিমা বিশ্ব তথা ন্যাটোর প্রতি নৈতিক সমর্থন প্রকাশ করে জানান যে, কসোভোতে সার্বিয়ান বর্বরতা অনেক দিন যাবত বরদাশত করা হয়েছে। অন্যদিকে হান্স মাগনুস এঞ্জেঞ্জবার্গ, ক্রিসটা ওলফ কিংবা মার্টিন ওয়ালসারের মতন বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সারীর ব্যক্তিত্বরা স্বভাববিরুদ্ধ নীরবতায় ছিলেন।

জার্মানির প্রাপ্তির খাতায় আরেক নোবেল পুরস্কার যোগ করা রোমানিয়ান বংশোদ্ভুত হেরটা মুলারের এক প্রবন্ধকে নিয়ে শুরু হয়েছিল তুমুল বিতর্ক। রোমানিয়ার কুখ্যাত স্বৈরচারী কমরেড চশেস্কুর শাসনামলে নির্যাতনের শিকার হওয়া অদম্য এই সাহিত্যব্যক্তিত্ব মিলোশেভিচের চালানো নির্মম গণহত্যায় বিক্ষুব্ধ হয়ে তাকে বিশ্ব জুড়ে আরেক মহাদাঙ্গা বাঁধানোর নায়ক হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরলেন। মুলার লিখলেন, তিনি এমনই এক ব্যক্তি যেখানেই যান নতুন নতুন অগণিত গোরস্তান রেখে আসেন। তিনি দেশকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন, যেখান থেকে ফিরবার আর কোন পথ নেই। তিনটি যুদ্ধে হারার পর এখন কসোভোতে জয় চান, তাকে কেউ না থামালে গন্তব্য এরপর মন্টেনেগ্রো। ‘স্তালিনিস্ত’ আখ্যাও দিলেন তিনি মিলোশেভিচকে।

নোবেল ঘোষণার পরপরই টুইটারে শোর উঠে যায় সাহিত্য এবং রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক কিংবা দায়িত্বরত ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়ায়। যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োজিত কসোভো অ্যাম্বাসেডর ভ্লোরা সিটাকু হান্ডকের এই নোবেল প্রাপ্তিকে মিলোশেভিচ রেজিমের নির্যাতিত মানুষদের চামড়ায় কষাঘাত করার সঙ্গে তুলনা করেন। সালমান রুশদী তার বিশ বছর আগে ছোড়া হান্ডকে বিষয়ক মন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেন ভ্লোরাকে। ১৯৯৯ সালে রুশদী হান্ডকেকে ‘বছরের সেরা উন্মাদ’ আখ্যা দিয়েছিলেন। বসনিয়ান জার্মান ঔপন্যাসিক সাশা স্টানিসিক পিটার হান্ডকের অবস্থান এবং ইতিহাসের অন্ধকার দিকে আশ্রয় নেয়াকে স্রেফ ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত করলেন, হান্ডকে বাস্তবতাকে গ্রহণ করে নিতে ভীষণভাবে ব্যর্থ সেটা স্পষ্ট করে দেন।

সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্ট সমালোচকদের উদ্ধৃতির রেশ ধরে পুরো ঘটনাটিকে লজ্জাজনক, রাজনৈতিক, সমঝোতা, অসহনীয়, বাজে হিসেবে অভিহিত করতে থাকে সঙ্গত কারণেই। আলবেনীয় প্রধানমন্ত্রী ইদি রামা টুইটারে তার বমনেচ্ছার কথা রাখ-ঢাক না রেখেই লিখলেন। সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেন্ড সাকাজের মন্তব্যে গণহত্যার অস্বীকারকারী পুরস্কৃত করবার বিষয়টি ভীষণ বিচ্ছিরি আর কলঙ্কের। মিলোশেভিচের শকুন নজর একদা যে কসোভোতে ছিল সেখানকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচি হান্ডকের শিরোপা যুদ্ধাক্রান্ত মানুষের স্মৃতিকে আরও দুঃসহ করে তুলেছে বলে মতামত ব্যক্ত করেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে বলেন, সাহিত্যে নোবেল কোন বর্ণবাদীকে দেবার মাধ্যমে মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে।

স্লোবোদান মিলোশেভিচের নৃশংস আমলের একজন কুখ্যাত সমর্থকের নোবেল প্রাপ্তিতে চরম বিস্ময় প্রকাশ করে বার্তা পাঠান ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এবং লেখক অরল্যান্ডো ফিগস। পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে স্রোতের মত বিবৃতি, মন্তব্য, বক্তব্য আসতেই থাকে। আমেরিকান লিটারেরি সোসাইটি এবং মানবাধিকার সংগঠন পেন আমেরিকাও জানিয়ে দেয়, “ঐতিহাসিক সত্যকে বিনষ্ট করে এবং স্লোবোদান মিলোশেভিচ, রাদোভান কারাদজিচের মতো গণহত্যার অপরাধীদের জনসমর্থনে নিজের কণ্ঠকে প্রকাশ্যে ব্যবহার করে এমন একজন লেখককে নির্বাচিত করায় আমরা হতবাক হয়েছি।”

নোবেল কমিটির দাবি সাহিত্যের পরিমাপে পিটার হান্ডকে নোবেল জিতে নিয়েছেন, রাজনীতি এখানে অপ্রাসঙ্গিক। নোবেল একাডেমি হান্ডকের ভাষাগত দক্ষতায় মানুষের অভিজ্ঞতাকে অনুপমভাবে সংজ্ঞায়িত করবার ক্ষমতাকে সম্মানিত করার জন্য তার মাথায় সাহিত্যের রাজমুকুটটি তুলে দিয়েছে। হান্ডকের ভাষা প্রজন্মের ভাষা, পরবর্তী প্রজন্মের হাতে অর্ঘ্য হিসেবে তুলে দেবার মতো যার পরতে পরতে নতুনত্ব। ঔপন্যাসিক, পরিচালক ছাড়াও নাট্য জগতে পিটার হান্ডকে ভীষণ জ্বলজ্বলে, শুকতারা যেমন। একাডেমির সিদ্ধান্তকে হান্ডকে সাধুবাদ দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী সমালোচনা-নিন্দা-বিতর্ক কোনকিছুই স্পর্শ করতে পারেনি সাহসী এই সিদ্ধান্তকে।

অবশ্য এই পুরস্কার আর যাই হোক রাজনীতির পঙ্কিল এক পথের কথাও হয়ত অবচেতনভাবেই মনে করিয়ে দেয়। আরও মনে করিয়ে দেয় অজনপ্রিয়-অপরিচিত সাহিত্যিক নির্বাচন নিয়ে গতানুগতিক বিতর্ক বা অসন্তোষের চাইতে সদ্য পার করা উনিশে এসেও হয়ত তীক্ষ্ণ মেধার আবরণে মারদাঙ্গা খুনে রাজনৈতিক বিশ্বাসও সদর্পেই টিকে থাকতে পারে।

সংযুক্তি:

১. নাৎসি জার্মানির একীভূত সশস্ত্র বাহিনীর নাম ভেয়ামাখট (Wehrmacht)

২. ১৯১৮ সালে দক্ষিণ ইউরোপে সার্বিয়া, মন্টেনিগ্রো, স্লোভেনিয়া, অর্থডক্স খ্রিষ্টান অধ্যুষিত মেসেডোনিয়া, ক্রোট-সার্বদের ক্রোয়েশিয়া আর বসনিয়া হার্জেগোভিনা মিলে গঠিত হল কিংডম অব সার্বস ক্রোটস অ্যান্ড স্লোভেনস। ১৯৩২ সালে যুগোস্লাভিয়া নামে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেল সে রাষ্ট্র। যুগোস্লাভিয়া অর্থ দক্ষিণ স্লাভদের দেশ। মোটামুটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই মার্ক্সবাদী জোসিপ ব্রজ টিটোর বজ্র শাসনের অধীনে তবে সুসংহত ঐক্যের বার্তা জপতে জপতে দিন পার করছিল সেই দক্ষিণ স্লাভদের দেশটি।

আশির দশকের শুরুতেই মার্শাল টিটোর দেহত্যাগের পরপর ভাঙনের ফিসফাস শুনতে পাওয়া যাচ্ছিলো।  যুগোস্লাভিয়াকে ভাঙবার কারণগুলোও অযৌক্তিক ছিলো না। অর্থনৈতিক সঙ্কট শুরু হবার পর স্বাভাবিকভাবেই দেখা দিল রাজনৈতিক অস্থিরতা। জাতীয়তাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল এবং দিন গড়ালে চরমপন্থার বিষবৃক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে লাগলো। ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা বারবার সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে বীভৎস এক ইতিহাস লেখা হয়ে গেল আপনাতেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে চুক্তি সমঝোতা বা শান্তিপূর্ণ কোন উপায়ে রিপাবলিক অব যুগোস্লাভিয়া ভেঙে টুকরো টুকরো হলো না বরং বিপুল রক্তক্ষয়ের বিনিমিয়ে অঙ্গচ্ছেদ ঘটলো রাষ্ট্রটির। পুরো দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা জাতিগত সংঘাতের মধ্য দিয়ে ভাঙনের তীব্র আওয়াজে প্রকম্পিত হচ্ছিল এক-একটা  জনপদ। বলকান যুদ্ধের বিভীষিকায়, জাতিতে জাতিতে দাঙ্গা-জেনোসাইডে ক্রোশিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা আর স্লোভেনিয়া স্বাধীন হয়ে যায়। সার্বিয়া আর মন্টেনিগ্রো ‘ফেডারেল রিপাবলিক অব যুগোস্লাভিয়া’ নাম নিয়ে কিছুকাল টিকে থাকে। এরপর ২০০৬ সালে মন্টেনিগ্রোর স্বাধীন হবার মধ্য দিয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যায় যুগোস্লাভিয়া। পরবর্তীতে সার্বিয়া ভেঙে জন্ম হয় স্বতন্ত্র সার্বিয়া ও কসোভোর।

৩. সার্বিয়া মন্টেনিগ্রোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন স্লোবোদান মিলোশেভিচ। পপুলিস্ট মিলোশেভিভ ক্ষমতা  পাবার পর বৃহত্তর সার্বিয়া গঠনে উদ্বুদ্ধ হন। ক্ষমতায় আসীন হবার সঙ্গে সঙ্গেই যুগোস্লাভিয়া থেকে আলাদা হওয়া বাকি  দেশগুলো স্বাধীনভাবে নিজেদের পরিচালনা করতে পারবে কি পারবে না তাই নিয়ে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রধান দেশ হিসেবে সার্বিয়া হস্তক্ষেপ চালানো শুরু করল। জাতিসত্তার পাশাপাশি ধর্ম বিবেচিত হলো মোটাদাগে। ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ান অধ্যুষিত স্লোভেনিয়া, মন্টেনিগ্রো কিংবা মেসেডোনিয়ার ব্যাপারে ওই সময় মিলোশেভিচ নজরদারী না করলেও বসনিয়া হার্জেগোভিনা কিংবা কসোভো নিয়ে ভিন্ন পরিকল্পনা আটছিল। আবার অন্যদিকে ক্রোশিয়ার সংখ্যাগরিষ্টদের ধর্ম ক্যাথলিক হলেও সেখানকার সংখ্যালঘু সার্বরা নতুন ক্রোশিয়ার নীতির প্রতি আস্থাহীনতা প্রকাশ করে।

এ ছাড়া মিলোশেভিচের পরম লক্ষ্য এবং রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি ছিল বৃহত্তর সার্বিয়া, শুধুমাত্র সার্বরাই বসবাস করবে তার স্বপ্নের সেই সার্বিয়ায়। সব মিলিয়ে মিলোশেভিচ প্রথমেই ক্রোশিয়ায় দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেয়। ক্রোশিয়ার ভুকোভারকে টার্গেট করে সার্ব আর্মি, রক্ষীবাহিনী-মিলিশিয়া ব্যবহার করে ঐ দাঙ্গায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্রোট নাগরিক, যুদ্ধবন্দী, মুসলিম ও হাঙ্গেরীয় হত্যা করা হয়। ভুকোভারে এরপর সার্ব আধিপত্য জারি হয়। পরবর্তীতে বসনিয়ার উত্তর-দক্ষিণাংশের শতকরা পঞ্চাশ থেকে একশত ভাগ বসনীয় মুসলিমকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছিল সার্ব ফোর্সের সেই এথনিক ক্লিনজিং মিশনে। সব মিলিয়ে গোটা বসনিয়ায় ৬৪ হাজার জীবন শেষ হয়ে গেল চিরতরে, অর্ধলাখ ধর্ষণের হিসেব পাওয়া যায়। অগণিত মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর